Editorial

মুকুল মমতার ছায়াযুদ্ধ, মাঝখানে কিংকর্তব্যবিমূড় মঞ্জু-দিলীপ! ক্ষতি বা লাভ কার?? সম্পাদকের কলমে।

অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি): মুকুল রায় বিজেপি তে যোগ দিয়েছেন মাত্র ৩ মাস, ভাল বলুন বা মন্দ পোর্টফোলিও বিহীন মুকুল রায়কে এই ৩ মাসের জমানাতেই ফেস করতে হচ্ছে তিন-তিনটি উপনির্বাচন। যদিও পোড় খাওয়া রাজনীতিক মুকুল বাবুর কাছে নির্বাচন টা মোটেই নতুন ব্যাপার নয়। কিন্তু যে দলে তিনি গিয়েছেন সেই দল যে এই তিনটি আসনে প্রার্থী দিতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে সে কথা বুঝতে অনেক বেশি রাজনৈতিক বোধবুদ্ধির প্রয়োজন নেই। সবং তৃণমূল রেকর্ড মার্জিনে জিতলেও বিজেপি-র ব্যাপক ভোট বৃদ্ধি প্রশংসা এনে দিয়েছে মুকুল রায়ের ঝুলিতে। জন জাগরন যাত্রায় যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই প্রচুর ভিড় হচ্ছে, মুকুল বাবু নিজেই বলেছেন এত মানুষ আমাকে ভালবাসে তা আগে জানতাম না! এবার কথা হচ্ছে রাজ্য রাজনীতিতে এই মুহুর্তে সব থেকে চর্চিত কেন্দ্র নোয়াপাড়া তথা তাঁর বিজেপি-র প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে।
বিজেপি ঘোষণা করল তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়িকা মঞ্জু বসু প্রার্থী হচ্ছেন, শুধু আমরা নয় সবাই জানত এর পিছনে রয়েছে মুকুল রায়ের হাত। কিন্তু কিচ্ছুক্ষন পরেই মঞ্জু দেবী সংবাদ মাধ্যম কে জানালেন “বিজেপি প্রার্থী হিসেবে আমার নাম ঘোষণা করার কথা আমাকে জানানো হয়নি।” একই সঙ্গে তিনি বলেন “মুখ্যমন্ত্রী যেটা ঠিক করবেন সেটাই হবে। তাঁর উপর আমার পূর্ণ আস্থা, ভরসা, বিশ্বাস আছে। তিনি যেটা ভালো বুঝবেন করবেন।” তিনি আরও বলেন “আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, ২০০০ সালে স্বামী যখন প্রয়াত হলেন তখন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহছায়ায় আছি। তিনি আমার মাথার উপর আছেন।”
এক্ষেত্রে বিজেপি বা মুকুল রায়ের ব্যার্থতা বা তৃণমূলের চাপের থেকে বেশি বলে যেটা আমার অন্তত মনে হচ্ছে, আপাত নরম মঞ্জু বসু একটা চরম ট্রাম্প কার্ড খেললেন, এটা বোঝার জন্যে তার প্রতিক্রিয়ার একটা বিশেষ লাইনই যথেষ্ট “মুখ্যমন্ত্রী যেটা ঠিক করবেন সেটাই হবে। তাঁর উপর আমার পূর্ণ আস্থা, ভরসা, বিশ্বাস আছে। তিনি যেটা ভালো বুঝবেন করবেন।” এই কথার মানে বোঝা কি খুব মুশকিল? একটু সহজ বাক্যে বুঝে নিলে মানে টা এমন দাঁড়ায় না কি যে “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী আমি আপনার ছাতার তলাতেই আছি, অন্য কোথাও যাইনি, আমাকেই প্রার্থী করা হোক!!!” কারন এই কথা তিনি কখন বললেন যখন বিজেপি প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করে দিয়েছে। আর তাতে তৃণমূল তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আরও একটা বার্তা দেওয়া হল, দেখুন কেমন বিজেপি-সর্বোপরি মুকুল রায় কে বেইজ্জত করলাম!! আমাকে প্রার্থী করুন, না হলে দল বদল করে প্রাক্তন দলকে বেকায়দায় ফেলতে পারি! এক্ষেত্রে বলাই চলে মমতা বন্দোপাধ্যায় ব্যাপক খুশি হয়ে হয়ত ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ব্যারাকপুর থেকে প্রার্থীই করে দিলেন মঞ্জু দেবীকে(কারন দিনেশ ত্রিবেদী মুখ্যমন্ত্রীর কতটা গুড লিস্টে আছেন সে ব্যাপারে বিতর্ক হতেই পারে!) আর সেটা হলে বুঝতে হবে মঞ্জু দেবী পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের থেকে কোন অংশে কম যান না! যদিও সব কটাই সম্ভাবনা, কিন্তু এমন টা না হওয়ারও কিছুই নেই। আর একদম সময়ে ঝোপ বুঝে কোপ মারলেন দিলীপ ঘোষ, বলে দিলেন “মঞ্জু কে আমি চিনিনা, উনি মুকুল রায়ের লোক”!(যদিও আমার কাছে বিজেপি সূত্রে খবর ছিল মঞ্জু দেবী বিজেপি প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন) কিন্তু এতে লাভ কার হল? দিলীপ ঘোষ, মঞ্জু বসু, তৃণমূল, বিজেপি না মুকুল রায়ের!
১) তৃণমূল শেষ মুহুর্তে প্রার্থী বদলে দেবে বলে মনে হয় না, কারন তাতে অর্জুন সিংকে চটানো হয়ে যাবে। সুতরাং মঞ্জুর তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে শাসক দলের এমএলএ হওয়ার ‘অঘোষিত ইচ্ছা’ বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
২) বিজেপি যেভাবে বেইজ্জত হয়েছে তাতে তৃণমূল কিছু না প্রার্থী করলে মঞ্জু যদি বিজেপি প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে তা তো অনেক দূরের কথা ভবিষ্যতে মঞ্জুকে বিজেপি দলে নেবে কিনা সন্দেহ আছে। তাছাড়া ইতিমধ্যেই বিজেপি উলুবেড়িয়া আর নোয়াপাড়াতে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে, অনুপম মল্লিক উলুবেড়িয়ায় আর নোয়াপাড়াতে সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। কাজেই মঞ্জু বসুর রাজনৈতিক কেরিয়ার কি শেষের রাস্তায়? নাকি নতুন সুসজ্জিত রাস্তায়? কারন জিতুন বা হারুন যে কোন প্রতিষ্ঠিত দলের প্রার্থী হলেই অন্তত এরাজ্যে দেওয়াল লিখনে নাম টা থেকে যায় অনেকদিন, সেই সম্ভাবনা টা আর থাকছে না! কিন্তু সব চিত্র বদলে যাবে যদি মুখ্যমন্ত্রী প্রসন্ন হন!!!!
৩) দিলীপ ঘোষ স্টেটমেন্ট দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন দুটো কথা, প্রথমত- তিনি ঘাড়ে দায় নেবেন না, দ্বিতীয়ত- দলে ক্রমাগত বাড়তে থাকা মুকুলের প্রভাবকে তিনি খুব একটা ভালো চোখে নিচ্ছেন না! এক্ষেত্রেও বলছি সব কিছুই সম্ভাবনা। কিছু না হলেই ভাল কিন্তু ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যা তাই লিখছি অকপটে।
৪) মুকুল রায়, চিরকালের ড্যামেজ কন্ট্রোলার। নিখুঁত রাজনৈতিক বাক্যে বলে দিয়েছেন মঞ্জু চাপের মুখে পড়ে এমন কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। হতেই পারে কারন বীজপুরের তৃণমূল বিধায়ক মানে মুকুল রায়ের ছেলে শুভ্রাংশু কিছুদিন আগে খুন হতে পারেন এই আশঙ্কায় মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন, সেখানে মঞ্জু তো অনেক বয়স্কা! ভয় দেখানো সহজ। কিন্তু মঞ্জু যেভাবে পরোক্ষে মমতা ব্যানার্জীর কাছে নোয়াপাড়ার প্রার্থীপদ দাবী করলেন তাতে খুব ভয়টয় পেয়েছেন বলে তো মনে হল না! কিন্তু এতে মুকুল রায়ের তেমন ক্ষতি হলনা, কারন দক্ষ সংগঠক মুকুল দলে আসার পরে যেভাবে গেরুয়া পালে হাওয়া লেগেছে তার প্রশংসা কেন্দ্রীয় নেতাদের মুখে মুখে ঘুরেছে, সবং নির্বাচনের পর তো খোদ অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদী অভিনন্দন জানিয়েছেন!

এবার আসি বিজেপির কথায়, বাংলায় ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছেন আর ২ টো উপনির্বাচনে প্রার্থী দিতে হিমশিম খেয়ে গেলেন? তাহলে ৪২ টা লোকসভা আর ২৯৪ টা আসনে যোগ্য প্রার্থী দেবেন কিভাবে? ভেবে দেখেছেন? বলতেই পারেন আগেও তো প্রার্থী দিয়েছি তাহলে আবার কেন পারব-না। হ্যাঁ প্রার্থী আপনারা সবসময়ি দেন কিন্তু তার মধ্যে কটা যোগ্য প্রার্থী রয়েছে সে ব্যাপারে কি আপনারা নিশ্চিত ছিলেন গত নির্বাচন গুলোতে? সেভাবে চললে বিধানসভায় ডবল ডিজিট পেরতে এখনও অন্তত ৫ টা নির্বাচন লাগবে এরাজ্যে তা কি বিজেপি রাজ্য নেতারা জানেন না? ২০২১এ তো আপনারা ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছেন। এভাবে করবেন ক্ষমতা দখল?
আর ভুলে যাচ্ছেন নোয়াপাড়ার সিপিআইএম প্রার্থী কিন্তু বেশ প্রভাবশালী, অসুস্থ হলেও গার্গী-র পিছনে রয়েছেন গৌতম দেব। সহজে দাঁত ফোটাতে দেবেন না তৃণমূলের অর্জুন সিং কে, তাই গার্গীর ভালো লড়াই বা দ্বিতীয় হওয়া প্রায় নিশ্চিত। সেই যায়গায় আপনারা এভাবে প্রার্থী দিতে হিমশিম খেলেন!! এভাবে জিতবেন ২০২১?? একটু ভেবে দেখবেন..।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *